Bangladesh Map

স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ – বাংলাদেশের প্রাপ্তি ও চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নকামী একটি স্বাধীন দেশ। নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের শেষে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে পৃথিবীর বুকে এক স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। সদ্য স্বাধীন এবং যুদ্ধ বিধ্বস্ত এক দেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট স্বাভাবিকভাবেই ভালো ছিল না। তাই পথ চলার শুরুতেই এই দেশ নিয়ে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার ১৯৭৪ সালে বলেছিলেন “Bottomless Basket”. তার ধারনা ছিল এই বাংলাদেশ হবে “International Basket Case” [সূত্র - South Asia Crisis, 1971]

আজ সময়ের বিবর্তনে সেই বটমলেস বাস্কেটের বাংলাদেশই বিশ্বব্যাপী উদীয়মান অর্থনীতির দৃষ্টান্ত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অগ্রগতি-উন্নয়ন-সাফল্য এই ত্রয়ীর সমন্বয়ে আর্থ সামাজিকভাবে বাংলাদেশ এখন পৃথিবীর মধ্যে এক মর্যাদাকর আসনে বসতে সক্ষম হয়েছে। আর এর সুস্পষ্ট প্রতিফলেন হচ্ছে ১৫ মার্চ, ২০০৮ তে জাতিসংঘের Committee for Development Policy (CDP) সভায় বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উঠার যোগ্যতার স্বীকৃতিপত্র প্রদান। এই স্বীকৃতি বাংলাদেশের জন্য একদিকে যেমন মাইলফলক আবার আরেকদিক থেকে প্রচন্ড চ্যালেঞ্জিং ও। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা এবং ভবিষ্যতে এই উন্নয়নের অগ্রযাত্রা ধরে রাখাই এখন বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য।

Shadnan Mahmud's Blog

উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের শর্তঃ

১৫ মার্চ, ২০০৮ তে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাতারে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করে। মাথাপিছু জাতীয় আয়, মানবসম্পদ সূচক ও অর্থনৈতিক মূল্যমান সূচকে নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করার পর দেশটিকে এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ১৯৭৫ সাল থেকেই বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশগুলোর কাতারে রয়েছে। এই কাতারে থাকা আরও দুই দেশ মিয়ানমার ও লাওসও উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উন্নীত হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছে।

১৯৭১ সালে মোট ১৭টি দেশকে স্বল্পোন্নত দেশের স্বীকৃতি দিয়েছিল জাতিসংঘ। বর্তমানে এই কাতারে দেশ আছে ৪৭টি। এখান থেকে মাত্র ৫টি দেশ এখন পর্যন্ত চূড়ান্তভাবে উন্নয়নশীল দেশ হতে পেরেছে। সর্বশেষ ইকুয়েতোরিয়াল গিনি উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হয়।

স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের জন্য তিনটি সূচকে অগ্রগতি অর্জন করতে হয়ঃ

১. মাথাপিছু আয় (Gross National Income) ১২৩০ মার্কিন ডলার বা তার উপরে হতে হবে। (বর্তমানে ১৯০৯ মার্কিন ডলার)
২. মানবসম্পদ সূচক (Human Assets Index) ৬৬ বা তার উপরে হতে হবে। (বর্তমানে ৭৩.২)
৩. অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক (Economic Vulnerability Index) ৩২ বা তার নিচে হতে হবে। (বর্তমানে ২৫.২)

Shadnan Mahmud's Blog

প্রতি তিন বছর পর পর জাতিসংঘের একটি কমিটি Committee for Development Policy (CDP) স্বল্পোন্নত দেশগুলোর তালিকা পর্যালোচনা করে। পর্যালোচনার ভিত্তিতে এই কমিটি কোনো দেশকে তালিকায় অন্তর্ভূক্তকরণ বা অন্য কাতারে উত্তরণের সুপারিশ করে থাকে। তিন বছরের উত্তরণ প্রক্রিয়ার পর ২০২১ সালে বাংলাদেশের অগ্রগতি পর্যালোচনা করবে জাতিসংঘের ওই কমিটি। আগামী ছয় বছরে যদি তিন খাতেই (মাথাপিছু জাতীয় আয়, মানব সম্পদ সূচক ও অর্থনৈতিক মূল্যমান সূচক) বাংলাদেশ অগ্রগতি ধরে রাখতে পারে, তবেই ২০২৪ সালে দেশটিকে চূড়ান্তভাবে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে। প্রসঙ্গত, বাংলাদেশই একমাত্র দেশ যেটি উত্তরণের জন্য প্রয়োজনীয় তিন সীমারেখা একসঙ্গে অতিক্রম করেছে। স্বল্পোন্নত দেশগুলোর কাতার থেকে সফলভাবে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হতে আমাদেরকে এখনও দুইটি পর্যালোচনা অতিক্রম করতে হবে। একটি ২০২১ সালে ও পরেরটি ২০২৪ সালে।

উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণে বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জঃ

উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের প্রথম ধাপটা বাংলাদেশ সফলভাবে অতিক্রম করলেও চূড়ান্ত স্বীকৃতি লাভের দীর্ঘপথে বাংলাদেশকে নানামুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। এ প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য নিম্নরূপঃ

বৈদেশিক ঋণ

উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হলে আগের মত সহজ শর্তে বৈদেশিক ঋণ ও সাহায্য পাবে না বাংলাদেশ। বেসরকারি গবেষনা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, "উন্নয়নশীল দেশে উত্তীর্ণ হলে বাংলাদেশ আগের মত রেয়াতি সুদে ঋণ পাবে না। বাংলাদেশকে ক্রমান্বয়ে একটি মিশ্র অর্থায়নে যেতে হবে যেখানে উচ্চ সুদে বৈদেশিক ঋণ নিতে হবে।"

তবে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারে ভাবমূর্তি উন্নয়নের ফলে বৈদেশিক ঋণ পাওয়া সুবিধাজনক হতে পারে। ড. ভট্টাচার্য বলেন, "স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ মসৃণ ও টেকসই করতে দেশের অভ্যন্তরীন সুশাসন ও স্থিতিশীলতার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।"

রপ্তানী আয়

বাংলাদেশের রপ্তানী আয়ের ক্ষেত্রে, বিশেষত তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে বড় ধরণের প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা কমে যাওয়ার প্রভাব সবচেয়ে বেশী পড়বে পোশাক শিল্পের ওপর। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশ থেকে পোশাক রপ্তানীর ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান বাজার হওয়ায় ঐ অঞ্চলের সাথে বাণিজ্যের শর্তাবলী পরিবর্তিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য রপ্তানীর ক্ষেত্রে সুবিধা কমে যাওয়াটাই হবে বাংলাদেশের সামনে প্রাথমিক চ্যালেঞ্জ। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে গার্মেন্টস ছাড়াও আরো অনেক রপ্তানী পণ্য তৈরি করতে হবে। শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে।

উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হলে রপ্তানিতে শুল্ক সংযোজনের পাশাপাশি দেশের শিল্প কারখানায় শ্রমিক অধিকার ও মানবাধিকারের মত বিষয়গুলোতে আরো স্বচ্ছতা দাবী করবে আমাদানিকারকরা। সেক্ষেত্রে পণ্যের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে আশা করা যায় এসব প্রতিবন্ধকতা সহজেই পার করতে পারবে বাংলাদেশ।

"ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, বন্দরের ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি, সঠিক অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও সুষ্ঠ ও নিরবিচ্ছিন্ন জ্বালানিখাতের নিশ্চয়তা পেলে অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের মত বাংলাদেশও প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে পারবে"।

প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ

উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হওয়ায় বিদেশী বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আরো উৎসাহী হবেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ২০১৬ তে বেসরকারী একটি সংস্থার গবেষনায় দেখা যায় যেসব দেশ এখন পর্যন্ত স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে উত্তীর্ণ হয়েছে তাদের অধিকাংশের ক্ষেত্রেই প্রবৃদ্ধির হার, বৈদেশিক সাহায্য ও বৈদেশিক আয় কমেছে। তবে প্রায় প্রত্যেক দেশের ক্ষেত্রেই প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ বেড়েছে।

একটি দেশে প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়লে কর্মসংস্থান বাড়ার সুযোগ তৈরী হয়। তবে অনেকসময় দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় সঞ্চয়ের চেয়ে বৈদেশিক বিনিয়োগ আয় বেড়ে যাওয়ায় চলতি হিসাবে ঘাটতি (কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ডেফিসিট) সৃষ্টি হয়। যার ফলে বৈদেশিক আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য নেতিবাচক হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন সম্ভাবনা কতটা আছে তা যাচাই করা হয়। এক্ষেত্রে শুধু উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতিই যথেষ্ট হবে না।

একটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা, পরিবেশ ও প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালার বাস্তবায়ন, আঞ্চলিক পর্যায়ে সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোতে অংশগ্রহণের মাত্রা ও দীর্ঘমেয়াদে সুশাসন টিকে থাকার সম্ভাবনার ওপর প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ নির্ভর করে। বৈরী বৈশ্বিক পরিস্থিতি, উন্নত দেশগুলোর সংরক্ষণবাদী মনোভাব ও ভৌগলিক-কৌশলগত সমস্যা বাংলাদেশের বড় চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশে ইউএনডিপির আবাসিক সমন্বয়কারী মিয়া সেপ্পোর ভাষ্য অনুযায়ী, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশি পণ্যের ওপর গড়ে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ শুল্ক বাড়বে। এর ফলে বাংলাদেশকে বছরে ২৭০ কোটি ডলার রাজস্ব দিতে হবে। বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের মতে, এলডিসি থেকে বের হয়ে গেলে রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি ডলারের আঘাত পড়বে।

এছাড়াও আমাদের সামনে আরও কিছু বড় সমস্যা আছে। যেমন জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব। সামনের দিনগুলোতে এই সমস্যা আরও প্রকট হবে এবং উপকূলীয় অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক মানুষের স্থানচ্যুতি ও জীবিকার সংকট সৃষ্টি হতে পারে। এ ছাড়া ২০১৭ তে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে, যার নেতিবাচক প্রভাব শুধু অর্থনীতি নয়, সামাজিক ক্ষেত্রেও পড়বে।

এসব সমস্যা মোকাবিলা করে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য এখনই প্রস্তুতি শুরু করতে হবে। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সম্পদ বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ জোরদার করতে হবে, সে জন্য জ্বালানি ও অবকাঠামোগত ঘাটতি দূর করতে হবে। রপ্তানি খাতে তৈরি পোশাকের ওপর অধিক নির্ভরতা নয়, রপ্তানিপণ্যের বহুমুখীকরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। বিনিয়োগকারীদের আইনি সুরক্ষা দিতে হবে। মানবসম্পদের গুণগত মান উন্নয়নের মাধ্যমে সুদক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার ব্যাপক ও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে বেশি মনোযোগী হতে হবে। সর্বোপরি সুশাসন প্রতিষ্ঠার দিকে নজর দিতে হবে।

Leave a Comment