bdnews24

কেমন ঢাকা চাই: গোলটেবিলে আমরা কয়েকজন নাগরিক সাংবাদিক

আমি বরাবর গর্তজীবী মানুষ। ঘরের এক কোনে পড়ে থাকি বলে খুব কাছের মানুষ ছাড়া বাকি সবার সাথেই যোগাযোগ খুব কম। এজন্য আমাকে খুঁজে পাওয়াও ঝামেলা। এমন অবস্থাতেও ব্লগ ডট বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সঞ্চালক আইরিন সুলতানা আমাকে খুঁজে বের করে ফোন দিয়ে বললেন, “নির্ঝর কোথায় আছেন? ১১ ফেব্রুয়ারি আসতে পারবেন না?”

আমি মনে মনে বলি, আমাকে খুঁজে পেলো কেমনে! আর মুখে বললাম “জ্বি আপু, জ্বি আপু অবশ্যই আসব।”

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কার্যালয়ে এর আগে আরো দুই অনুষ্ঠানে যাওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। অনুষ্ঠানগুলো এত সুন্দর আর গোছানো হয় যে কয়েকদিন মন ভালো রাখার জন্য এমন একটা অনুষ্ঠানে গেলেই হয়ে যায়। এতগুলো ভালো মানুষের সাথে দেখা হয়, কিছু চমৎকার মানুষের সাথে কিছু ভালো সময় দেখতে দেখতে চলে যায়। এমন কিছু তো মিস করার প্রশ্নই আসে না। তাই ১১ ফেব্রুয়ারিতে সন্ধ্যা ৬টায় ঠিক ঠিক পৌঁছে গেলাম।

এ দিনটা ব্লগ ডট বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীও। নাগরিক সাংবাদিকতার প্রিয় এই প্লাটফর্মটির নয় বছর পূর্তিতে অনেক শুভেচ্ছা।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে গোলটেবিল বৈঠকে আমরা যেখানে বসেছিলাম সেই টেবিলটা কিন্তু লম্বা। লম্বা টেবিলে গোলটেবিল বৈঠক কীভাবে হবে এ নিয়ে যখন আকাশ-পাতাল ভাবছি তখনই প্লাটফর্মের আরো কয়েকজন নাগরিক সাংবাদিকও পৌঁছে গেলেন।

পরিচয় পর্ব ছিল এক মজার কাহিনী। নাহিদ দিপার কাছে রোদেলা নীলা জানতে চাইলেন, “জাহাঙ্গীরনগরের কোন ব্যাচ?” ব্যাচ জানা গেল। তারপর নাহিদ দিপা আবার শাহিন রেজাকে বললেন, “আপনি কোন ব্যাচ?” কথায় কথায় জানা গেল এখানে অনেকেই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী।

একটু পরেই আমরা মূল পর্বে ঢুকে গেলাম; আমাদের আলোচনার বিষয়  ঢাকাকে  কেমন দেখতে চাই। আইরিন সুলতানার সঞ্চালনায় আমরা একে একে আমাদের স্বপ্নগুলো আর বাস্তবতার কথা তুলে ধরতে লাগলাম।

নাহিদ দিপা নারীস্বাস্থ্য নিয়ে খুব সুন্দর করে কথা বললেন; আমার মনে হচ্ছিল তাকে ঢাকার মেয়রের সামনে বসিয়ে দেওয়া দরকার। নাহিদ দিপা একটা একটা করে বলবেন এবং তা শুনে শুনে মেয়র নোট করবেন।

আমরা খুবই অলস জাতি বলেই সম্ভবত ভেবে দেখি না যে দেশকে  উন্নয়নের রোল মডেল বলছি সেই দেশে একজন নারী কেন রাস্তায় টয়লেট নিয়ে চিন্তিত থাকবে। যানজট, সড়ক সমস্যা, পরিবেশ কত কিছু নিয়েই তো বলি; কিন্তু রাস্তাঘাটে, শপিং মলে, বা কোনো প্রতিষ্ঠানে নারীর জন্য টয়লেটের ব্যবস্থা নিয়ে কয়জনই বা চিন্তা করি? নাহিদ দিপাকে এই জরুরি কথাটি তুলে ধরার জন্য বিশেষ ধন্যবাদ দিতেই হয়।

যখন অনুষ্ঠান শুরু হয় তখন ভেবেছিলাম বয়সে আমিই সবচেয়ে ছোট। পরে জানা গেল আমিনুর রহমান হৃদয় আমার চেয়েও বয়সে ছোট। তবে আমরা তরুণরাও যে ঢাকা নিয়ে গভীর করে ভাবি তা আমিনুর রহমান হৃদয়ের কথায় বুঝতে পারি। যখন আমিনুর রহমান হৃদয়ের মত নাগরিকরা এই নগরের হাল ধরবে তখন ঢাকা যে অট্টালিকার শহর থেকে মানবিক শহর হয়ে যাবে তা আমি নিশ্চিত।

বোরহান বিশ্বাস ইভিএম নিয়ে তার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরলেন আলোচনার মধ্যে। ভোটের দিন এত কম ভোটার নিয়ে তার কন্ঠে আক্ষেপের মতও দেখা গেল। তাছাড়া ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের জল সবুজে ঢাকা প্রকল্প নিয়েও নিজের অভিজ্ঞতার কথা আমাদের শোনালেন বোরহান বিশ্বাস।

নুরুন্নাহার শিরীন এবং আর এন তমা বলছিলেন আমাদের সড়ক সমস্যা আর ভোটের সময় শিশুদের প্রচারণার কাজে লাগানো নিয়ে।

সড়ক পরিবহন সেক্টরে এত এত সমস্যা থাকার পরেও আমরা কেন চোখ বুঁজে থাকি, কেন এত এত আইন থাকার পরেও আমরা তা প্রয়োগ করি না তা নিয়ে আর এন তমা এক রকম হতাশাই দেখলাম।

নুরুন্নাহার শিরীন বললেন শিশুদের প্রচারণার কাজে লাগানোর ব্যাপারে। এক প্যাকেট চিপস আর এক ঠোঙ্গা সিঙ্গাড়া বাচ্চা একটা ছেলের হাতে ধরিয়ে দিয়ে রাজনৈতিক শ্লোগান দেয়ানো কোন শিষ্ঠাচারের মধ্যে পড়ে তা এখন আমাদের ভাববার সময় হয়েছে।

শফিক মিতুল সম্ভবত সাংবাদিকতায় পড়েছেন। উনি খুব গুছিয়ে কথা বলবেন সেটাই স্বাভাবিক। আইরিন সুলতানার পর সম্ভবত সবচেয়ে গোছানো কথা বলছিলেন শফিক মিতুল। ঢাকা নিয়ে তিনি বেশ ভাবেন, বেশ পড়ালেখা করেন – তা বারবারই মনে হচ্ছিল।

শাহিন রেজা আমাদের মধ্যে সবচেয়ে চুপচাপ ছিলেন। কিন্ত যেই স্পিকার হাতে পেলেন ঢাকার সমস্যাগুলো কীভাবে সমাধানযোগ্য তা বলে গেলেন খুব গুছিয়ে।

নাগরিক সাংবাদিকদের গোলটেবিল আলোচনার সবচেয়ে বড় তারকা ছিলেন আমাদের রোদেলা নীলা এবং মোনেম অপু। এই আয়োজনে ‘শ্রেষ্ঠ বক্তা’ হিসেবে কাউকে বাছাই করে নেওয়ার সুযোগ থাকলে আমি এই দুজনকেই তা দিতাম।

রোদেলা নীলা কাউন্সিলর-মেয়রদের অনেক কাজের সমালোচনা যেমন করেছেন, আবার নাগরিক হিসেবে আমরা যে খুবই অসচেতন তা বলতেও দ্বিধা করেননি। আর মোনেম অপু শুনিয়েছেন ক্লিন সিটির স্বপ্নের কথা, সুন্দর ঢাকার কথা।

ঠিক ৬টা ৩৫ মিনিটে শুরু হয়ে কীভাবে যে ঘড়িতে ৮টা ১৫ মিনিট হয়ে গেল তা টের পাইনি। বৈঠক শেষে আপ্যায়নের জন্যও বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে ধন্যবাদ। পুরো অনুষ্ঠানটি যারা ভিডিও করেছেন, ছবি তুলেছেন তাদেরও ধন্যবাদ দিতেই হবে।

খেতে খেতে রোদেলা নীলা আমাকে বললেন, “তোমার যদি ফেইসবুক না থাকে তো তোমাকে খুঁজে বের করলো কীভাবে?” আমি বললাম, “আপু, জানি না তো।” তখন রোদেলা নীলা মজা করে বলেন, “বুঝছো আইরিন তো গোয়েন্দা, ঠিকই বের করে ফেলবে।” আমাদের এই অসাধারণ সঞ্চালক ‘গোয়েন্দা’ আইরিন সুলতানা আবার কোনো অনুষ্ঠানে আমাদের খুঁজে বের করে আবার নিয়ে যাবেন সেই আশায় থাকলাম।

চলে আসার আগে দেখা হল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদীর সাথে। নাগরিক সাংবাদিকতার সম্ভাবনা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে দারুণ কিছু কথা বললেন তিনি।

সবার কথাই বললাম, কিন্তু নিজের কথাই বলা হয়নি। প্রশ্ন ছিল, কেমন ঢাকা চাই? আমি যখন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের অফিসের পথে ছিলাম তখন গুগল ম্যাপে শাহবাগ থেকে দূরত্ব দেখাচ্ছিল ৫ দশমিক ১ কিলোমিটার। এই সামান্য রাস্তাটুক আমার যেতে হয়েছে পৌনে দুই ঘন্টায়। আসার সময় লেগেছে দেড় ঘণ্টা। এমন ঢাকায় থেকে ঢাকাকে নিয়ে আমি সুন্দর স্বপ্ন দেখতেও ভয় পাই। শুধু আশা করি ঢাকার দায়িত্বে যিনি আসবেন তিনি ঢাকাকে নিজের শহর না ভেবে নিজের ঘর ভেবে কাজ করবেন।

নির্বাচনের আগে ঢাকাকে বিশ্বের অন্যতম সুন্দর নগরী হিসেবে গড়ে তোলার যে প্রতিশ্রুতি প্রার্থীরা দিয়েছিলেন অতটা আমি আশা করি না। কিন্ত চাইলেই তারা ৫ কিলোমিটারের রাস্তা ২০ মিনিটে পাড়ি দেওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে পারেন, চাইলেই তারা ঢাকা থেকে ডেঙ্গু ঝেঁটিয়ে বিদায় করতে পারেন বলে আমার মনে হয়। সেটা তারা করবেন কি না তা সময়ের হাতেই তোলা থাক। আমরা নাগরিক সাংবাদিকরা তো নজর রাখছিই এসবে।

10 Comments

  1. আমি বেশ কদিন ঢাকার বাহিরে ছিলাম। জানতে পারলে অবশ্যই জয়েন করতাম। আশা করি পরের কোন আড্ডায় সবার সাথে যুক্ত হতে পারব।

Leave a Comment